ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ কত প্রকার? জিহাদ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যার অর্থ “সংগ্রাম” বা “প্রচেষ্টা”। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে জিহাদ বলতে আল্লাহর পথে সত্য প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করাকে বোঝায়। জিহাদ শুধুমাত্র যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিস্তৃত অর্থ রয়েছে। ইসলামী শরিয়তের আলোকে জিহাদকে প্রধানত চারটি প্রকারে ভাগ করা যায়। নিচে এই প্রকারগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. জিহাদ বিন-নাফস (নিজের সাথে জিহাদ)

জিহাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো নিজের মনের সাথে সংগ্রাম। এটি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তি, পাপাচার এবং শয়তানের প্রলোভনের বিরুদ্ধে লড়াই। এই জিহাদের মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজেকে পবিত্র করার চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।” (ইবনে হিব্বান)। এই জিহাদের মধ্যে রয়েছে নামাজ, রোজা, সৎকর্ম, ধৈর্য ধারণ এবং নিজেকে পাপ থেকে দূরে রাখা।

২. জিহাদ বিল-ইলম (জ্ঞানের মাধ্যমে জিহাদ)

জ্ঞান অর্জন এবং তা প্রচার করাও জিহাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই জিহাদের মাধ্যমে মানুষ অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করে। কুরআন শরীফে আল্লাহ বলেন, “যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা যুমার: ৯)।

জ্ঞানের মাধ্যমে জিহাদের মধ্যে রয়েছে ইসলামের সঠিক বার্তা প্রচার, মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান এবং ভ্রান্তি দূর করার প্রচেষ্টা। শিক্ষক, আলেম এবং দাঈরা এই জিহাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৩. জিহাদ বিল-মাল (সম্পদের মাধ্যমে জিহাদ)

এই জিহাদ বলতে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করাকে বোঝায়। ইসলামে দান-সদকা, জাকাত এবং দরিদ্রদের সাহায্য করা অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ। যখন কোনো সম্প্রদায় বা জাতি বিপদে পড়ে, তখন তাদের সাহায্যে সম্পদ ব্যয় করাও জিহাদের একটি রূপ।

এই জিহাদের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা প্রসার এবং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখা যায়। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আল-ইমরান: ৯২)।

৪. জিহাদ বিল-সাইফ (সশস্ত্র জিহাদ)

এটি জিহাদের সেই রূপ যা সাধারণত যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংগ্রাম হিসেবে পরিচিত। তবে এই জিহাদ কঠোর শর্তসাপেক্ষে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুমোদিত। সশস্ত্র জিহাদের উদ্দেশ্য হলো নিপীড়ন, অত্যাচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ইসলামে যুদ্ধের ক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসামরিকদের ক্ষতি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করো, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না।” 1

উপসংহার

জিহাদ ইসলামের একটি ব্যাপক ধারণা, যা শুধুমাত্র যুদ্ধ নয়, বরং নিজের সাথে সংগ্রাম, জ্ঞানের প্রসার এবং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। প্রত্যেক মুসলিমের উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী জিহাদে অংশগ্রহণ করা, যাতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসলাম শান্তি ও ন্যায়ের ধর্ম, এবং জিহাদের মূল লক্ষ্যও এই শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। তাই জিহাদের প্রকৃত অর্থ বুঝে এর প্রয়োগ আমাদের জীবনে প্রতিফলিত করা উচিত।

  1. সূরা বাকারা: ১৯০ ↩︎

Author

Islampidia Logo

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ!

আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর আপনার মেইলে পেতে চাইলে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।