ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ কি কি, ইহরাম অবস্থায় মুহরিমকে কোন কোন বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে? হজের সময় নিষিদ্ধ কাজ, মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম ইহরাম অবস্থায় জুতা ব্যবহার করা যাবে কি ? হজ ভঙ্গের কারণ কয়টি? ইহরাম অবস্থায় তেল ব্যবহার করা যাবে কি ? ইজতিবা কি ? এইসকল প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের আর্টিকেলটি সাজানো হয়েছে ।
এক নজরে যা যা পড়বেনঃ
ইহরাম কী?
ইহরাম (إحرام) শব্দটি আরবি শব্দ “حَرَامٌ” থেকে এসেছে, যার অর্থ “নিষিদ্ধ করা”। এটি হজ্জ বা উমরা পালনের জন্য একটি পবিত্র অবস্থা, যেখানে মুসলিমরা নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং শরীয়াহ অনুসারে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকে। ইহরাম বাঁধা হজ্জ বা উমরার প্রথম ফরজ কাজ।
- পুরুষদের জন্য: ইহরামের পোশাক হলো দুই টুকরো সাদা, সেলাইবিহীন কাপড়:
- ইজার: কোমরের চারপাশে জড়ানো নিচের কাপড়।
- রিদা: উপরের কাপড়, যা বাম কাঁধে জড়ানো হয়।
- মহিলাদের জন্য: সাধারণ শালীন পোশাক, যা শরীরের সমস্ত অংশ ঢাকে, মুখ ও হাত ছাড়া।
ইহরামের মাধ্যমে মুসলিমরা নিজেদের উপর কিছু কাজ হারাম করে নেন, যেমন সুগন্ধি ব্যবহার, শিকার করা, এবং যৌন সংসর্গ। এটি আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা প্রকাশ করে।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ কি কি
ইহরাম অবস্থায় নিম্নলিখিত কাজগুলি নিষিদ্ধ, যা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য:
| নিষিদ্ধ কাজ | বিবরণ | দলিল |
|---|---|---|
| চুল বা নখ কাটা | মাথার চুল, দাড়ি, শরীরের লোম, বা নখ কাটা নিষিদ্ধ। | কুরআন (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৬): “আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুণ্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবানীর পশু যথাস্থানে পৌঁছে যাবে।” |
| সুগন্ধি ব্যবহার | কাপড়ে, শরীরে, খাবারে, বা গোসলের সামগ্রীতে সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ। | হাদিস: “তাকে হানুত দিবে না।” (ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব) |
| যৌন সংসর্গ | স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে যৌন সংসর্গ বা এর সাথে সম্পর্কিত কাজ নিষিদ্ধ। | কুরআন (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৭): “কোনো যৌনাচার করবে না।” |
| শিকার করা | বন্য প্রাণী শিকার বা হত্যা করা নিষিদ্ধ। | কুরআন (সূরা মায়েদা, আয়াত ৯৫): “ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না।” |
| ঝগড়া-বিবাদ | তর্ক বা ঝগড়া করা নিষিদ্ধ। | কুরআন (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৭): “এবং ঝগড়া করবে না।” |
পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ কাজ
- সেলাইকৃত পোশাক পরা: পুরুষরা জামা, প্যান্ট, টুপি, মোজা, বা অন্যান্য সেলাইকৃত পোশাক পরতে পারবেন না। তাদের শুধুমাত্র ইজার ও রিদা পরতে হবে।
- দলিল: হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, “মুহরিম ব্যক্তি জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করবে না।” (ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব)
- ব্যতিক্রম: যদি কারো কাছে লুঙ্গি বা উপযুক্ত জুতা না থাকে, তবে পায়জামা বা মোজা পরার অনুমতি আছে।
মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ কাজ
- নেকাব বা স্কার্ফ পরা: মহিলাদের মুখ ঢাকা রাখা (নেকাব বা স্কার্ফ) নিষিদ্ধ। তবে, অপরিচিত পুরুষের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ ঢাকতে পারেন, যদি কাপড় মুখ স্পর্শ করে তাতে সমস্যা নেই।
- দলিল: শরীয়াহ অনুসারে, মহিলাদের মুখ খোলা রাখা আবশ্যক (ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব)।
মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম
মহিলাদের জন্য ইহরামের পোশাক হলো তাদের সাধারণ শালীন পোশাক, যা শরীরের সমস্ত অংশ ঢাকে, মুখ ও হাত ছাড়া।
- পোশাকের বিধান: মহিলারা তাদের স্বাভাবিক পোশাক পরতে পারেন, তবে তা শালীন ও ঢিলেঢালা হতে হবে।
- মুখ ঢাকা: মুখ ঢাকা রাখা নিষিদ্ধ, তবে অপরিচিত পুরুষের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ ঢাকা জায়েজ।
- অন্যান্য নিয়ম: মহিলাদের জন্যও চুল কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, যৌন সংসর্গ, এবং শিকার করা নিষিদ্ধ। মহিলাদের মাথা মুণ্ডন করতে হয় না; তবে চুলের একটি অংশ কেটে ফেলতে হয়।
- বিশেষ মাসআলা: মহিলারা মাসিক ঋতুস্রাব বা প্রসবোত্তর স্রাবের সময়ও ইহরাম বাঁধতে পারেন, তবে তাওয়াফ ও নামাজ পড়া জায়েজ নয় (মাসিক আলকাউসার)।
ইহরামে জুতা পরার বিধান
- পুরুষদের জন্য: পুরুষরা স্যান্ডেল পরতে পারেন যা পায়ের আঙুল ও এড়ি ঢাকে, কিন্তু পায়ের উপরের অংশ ঢাকে না। সম্পূর্ণ পা ঢাকা জুতা পরা নিষিদ্ধ।
- দলিল: হাদিসে বলা হয়েছে, “তোমাদের কেউ যেন লুঙ্গি, চাদর ও জুতা পরে ইহরাম করে।” (হিজাজ হজ্জ ও উমরা)
- মহিলাদের জন্য: মহিলারা তাদের সাধারণ জুতা পরতে পারেন, যা তাদের পোশাকের সাথে মানানসই।
হজ্জ ভঙ্গের কারণ
ইহরাম অবস্থায় কিছু কাজ হজ্জ ভঙ্গ করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- যৌন সংসর্গ: ইহরামে যৌন সংসর্গ করলে হজ্জ ভঙ্গ হয় এবং প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে দম (পশু জবাই) দিতে হয়।
- ইহরামের পোশাকের নিয়ম ভঙ্গ: পুরুষদের জন্য সেলাইকৃত পোশাক পরা বা মহিলাদের জন্য মুখ ঢাকা রাখা।
- অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজ: চুল কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, শিকার করা ইত্যাদি।
- দলিল: কুরআন (সূরা মায়েদা, আয়াত ৯৫): “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে শিকার বধ করবে তার উপর বিনিময় ওয়াজিব হবে।”
- ব্যতিক্রম: ভুলবশত, অজ্ঞতাবশত, বা জোরপূর্বক নিষিদ্ধ কাজ করলে কোনো দায় বর্তায় না, তবে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তা থেকে বিরত হতে হবে (ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব)।
ইহরামে তেল ব্যবহার
ইহরামে সুগন্ধিবিহীন তেল ব্যবহার করা জায়েজ, তবে সুগন্ধযুক্ত তেল ব্যবহার নিষিদ্ধ। সতর্কতার জন্য তেল ব্যবহার এড়িয়ে চলা উত্তম। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ ভুলবশত সুগন্ধযুক্ত তেল ব্যবহার করে, তবে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তা ধুয়ে ফেলতে হবে।
ইজতিবা কী?
ইজতিবা (إضطباع) হলো তাওয়াফের সময় পুরুষদের রিদা (ইহরামের উপরের কাপড়) পরার একটি বিশেষ পদ্ধতি। এতে রিদা ডান বগলের নিচে রেখে বাম কাঁধের উপর জড়ানো হয়, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে। এটি তাওয়াফের সময় করা হয় এবং এটি সুন্নত।
ভুলবশত নিষিদ্ধ কাজ করলে কী হবে?
যদি কেউ ভুলবশত, অজ্ঞতাবশত, বা জোরপূর্বক নিষিদ্ধ কাজ করে, তবে তার উপর কোনো দায় বর্তাবে না।
- দলিল: কুরআন (সূরা আহযাব, আয়াত ৫): “কোনো বিষয়ে তোমাদের বিচ্যুতি ঘটে গেলে তাতে কোনো গুনাহ নেই, তবে আন্তরিক ইচ্ছাসহ হলে ভিন্ন কথা।”
- ব্যবস্থা: স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ ভুলে মাথা ঢেকে ফেলে, তবে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তা খুলে ফেলতে হবে।
আরও পরুনঃ
- জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন: ফজিলত ও করণীয়
- কোরবানির পশুর মাংস, মাথা বা চামড়া কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে কি?
- ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়াবলী
- সূরা বাকারা, আয়াত ২: ১৯৭
- ব্যাংকের চাকরি হালাল নাকি হারাম
ইহরামে কি মাথা ঢাকা যায়?
না, পুরুষদের জন্য ইহরামে মাথা ঢাকা নিষিদ্ধ। মহিলারা তাদের সাধারণ শালীন পোশাকের অংশ হিসেবে মাথা ঢাকতে পারেন, তবে মুখ খোলা রাখতে হবে।
ইহরামে কি সাবান ব্যবহার করা যায়?
সুগন্ধিবিহীন সাবান ব্যবহার করা যায়। তবে সুগন্ধযুক্ত সাবান বা শ্যাম্পু ব্যবহার নিষিদ্ধ।
ইহরামে কি দাঁত ব্রাশ করা যায়?
হ্যাঁ, সুগন্ধিবিহীন টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা যায়। সুগন্ধযুক্ত টুথপেস্ট এড়িয়ে চলতে হবে।
ইহরামে কি ছাতা ব্যবহার করা যায়?
হ্যাঁ, ছাতা ব্যবহার করা জায়েজ, যদি এটি মাথা ঢাকার জন্য সেলাইকৃত পোশাকের মতো না হয়।
ইহরামে কি ঘড়ি বা চশমা পরা যায়?
হ্যাঁ, ঘড়ি, চশমা, বা প্রয়োজনীয় আনুষাঙ্গিক জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ।

