কোরবানি, যা আরবি ভাষায় উদহিয়া নামেও পরিচিত, ইসলামে এটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি ঈদুল আজহার দিনগুলোতে (১০, ১১, এবং ১২ জিলহজ) পালিত হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ত্যাগের ঘটনাকে স্মরণ করে। এখানে আমরা কোরবানি কি, এর তাৎপর্য এবং এটি কার ওপর ওয়াজিব তা জানবো।

কোরবানি কি:

কোরবানি হলো ঈদুল আজহার সময় একটি পশু (যেমন ছাগল, ভেড়া, গবাদি পশু, বা উট) জবাই করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি ইবাদত। এটি হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ত্যাগের স্মরণে পালিত হয়, যিনি আল্লাহর আদেশে তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে কোরবানি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর পরীক্ষা নিয়ে একটি পশু দিয়েছিলেন। এই ঘটনা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।


কুরবানী হাদিস ও কোরআনের প্রেক্ষাপট:

কোরআন:
১.প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও” (সূরা আল-হজ্জ ২২:৩৪)

২.অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং কুরবানী কর*।
[১০৮:২] আল কাওসার


হাদিস:

“যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।” (ইবনে মাজাহ ৩১২৩, মিশকাত)
এটি কোরবানির গুরুত্ব ও এর ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে।

কোরবানি ফরজ, ওয়াজিব নাকি সুন্নাহ?
আলেমদের মধ্যে কোরবানির হুকুম নিয়ে দুটি মত রয়েছে:
ফরজ : কোরবানি ফরজ এরূপ বক্তব্য কোন আলেম দেননি এবং কোন হাদিসেও পাওয়া যায়নি।

ওয়াজিব: ইমাম আওজাঈ, লাইস, আবু হানিফা, এবং ইমাম মালিক ও আহমদের একটি মত অনুসারে কোরবানি ওয়াজিব। এটি কুরআন (১০৮:২) এবং হাদিসের উপর ভিত্তি করে, যেমন “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।” (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)।
সুন্নাহ মুআক্কাদাহ: ইমাম মালিক, শাফিঈ, এবং অধিকাংশ আলেমের মতে কোরবানি সুন্নতে মুআক্কাদাহ। তবে, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এটি পরিত্যাগ করা মাকরুহ।

যাইহোক, বাংলাদেশে হানাফি মাজহাবের প্রভাবের কারণে কোরবানিকে সাধারণত ওয়াজিব হিসেবে গণ্য করা হয়।


কার উপর কোরবানি ওয়াজিব?
কোরবানি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম নর-নারীর জন্য ওয়াজিব, যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। নিসাব হলো:
৭.৫ ভরি স্বর্ণ (৮৭.৪৮ গ্রাম), বা
৫২.৫ ভরি রুপা (৬১২.৩৫ গ্রাম), বা
তাদের সমমূল্যের সম্পদ ।
এই সম্পদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নগদ, স্বর্ণ, রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, অপ্রয়োজনীয় জমি, বা আসবাবপত্র। যদি কারো বিভিন্ন সম্পদ (যেমন, ১ ভরি স্বর্ণ এবং কিছু নগদ) যুক্ত হয়ে নিসাবে পৌঁছে, তবে তাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব। এটি তাদের জন্যও প্রযোজ্য যাদের উপর জাকাত ওয়াজিব।


কোরবানি না করার ফলাফল
যদি কেউ নির্ধারিত দিনে কোরবানি করতে না পারেন, তবে নিম্নলিখিত বিধান প্রযোজ্য:
পশু না কেনা হলে: একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪)।
পশু কেনা হলেও জবাই না হলে: পশুটি জীবিত অবস্থায় সদকা করতে হবে (ফাতাওয়া কাজিখান ৩/৩৪৫)।
মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি
মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি তখনই ওয়াজিব যদি তারা ওসিয়াত করে থাকেন। অন্যথায়, এটি নফল হিসেবে করা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব হিসেবে পৌঁছানো হয়।
প্রয়োগিক সমস্যা
বাংলাদেশে কোরবানি সংক্রান্ত কিছু সাধারণ সমস্যা পরিলক্ষিত হয়:
মহিলাদের গহনা: অনেক মহিলার গহনা নিসাব পরিমাণে পৌঁছে, কিন্তু তাদের নামে কোরবানি করা হয় না ।
যুবক-যুবতীদের সঞ্চয়: অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা বা বিয়ের জন্য সঞ্চয় থাকতে পারে যা নিসাবে পৌঁছে, কিন্তু এটি উপেক্ষিত হয়।
ভুল ধারণা: কিছু পুরুষ কোরবানি করেন যদিও তাদের উপর এটি ওয়াজিব নয়, অথচ তাদের স্ত্রী বা কন্যার উপর এটি ওয়াজিব হতে পারে।
প্রত্যেক মুসলিমকে ঈদুল আজহার সময় তাদের আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে কোরবানির করা উচিত।
উপসংহার
কোরবানি ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ত্যাগের মনোভাব প্রকাশ করে। এটি সক্ষমতাসম্পন্ন মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব, যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। এই ইবাদতটি শুধুমাত্র পশু জবাই করা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য ও ঐক্য উদযাপনের একটি মাধ্যম। সকল মুসলিমকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং এই ইবাদতটি যথাযথভাবে পালন করা উচিত।

Author

Islampidia Logo

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ!

আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর আপনার মেইলে পেতে চাইলে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

By Shakil Shawn

Shakil Shawn is a verified author of Islampidia.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।