ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলাম কী বলেভূমিকম্পের সময় মানুষের নিরাপত্তা ও সচেতনতা প্রদর্শন; ইসলামিক দৃষ্টিতে ভূমিকম্পে দোয়া, তওবা, নামাজ ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে

ভূমিকম্প মানুষের কাছে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। পৃথিবী যতই স্থির মনে হোক, কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে মানুষ বুঝে যায় তার শক্তি কত সীমিত। বিজ্ঞান ভূমিকম্পের ভৌত কারণ ব্যাখ্যা করে, আর ইসলাম এই ঘটনার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেয়। দুই দিক মিলিয়ে বিষয়টি বোঝা একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা একসঙ্গে আল্লাহর সৃষ্ট নিয়ম ও নিদর্শনকে তুলে ধরে।

ভূমিকম্প কেন হয়?

বিজ্ঞান বলে—পৃথিবীর ভূত্বক বিশাল টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এ প্লেটগুলো নড়াচড়া করলে চাপ সৃষ্টি হয়, আর সেই চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প হয়। এটি আল্লাহর সৃষ্টি করা নিয়মের অংশ, যা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে পৃথিবীতে প্রতিটি ব্যবস্থা তাঁর নিয়ন্ত্রণে।

ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

ইসলামের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। বরং এটি মানুষের জন্য চিন্তা, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। আল্লাহ সূরা আল-মুলকে সতর্ক করে বলেছেন:

“তোমরা কি নিশ্চিত হয়ে গেছো যে, যিনি আসমানে রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে নিয়ে এ জমিনকে ধ্বসিয়ে দেবেন না; অতঃপর তা আকস্মিকভাবে থর থর করে কাঁপতে থাকবে?”
(সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৬)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায় যে পৃথিবীর নড়াচড়া আল্লাহর ইচ্ছারই প্রকাশ। মানুষের পাপ, অন্যায় এবং দায়িত্বহীনতা বাড়লে কখনও কখনও আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করার জন্য এমন নিদর্শন দেন। তবে প্রতিটি ভূমিকম্পকে শাস্তি বলা ভুল। অনেক সময় এটি পরীক্ষা, আবার অনেক সময় এটি কেবল আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।

রাসূল ﷺ বলেছেন, বিপদের সময় আল্লাহ কখনও তাঁর নিদর্শন দেখান, যাতে মানুষ সচেতন হয়। তাই ভূমিকম্প মানুষের জন্য একটি শিক্ষা—জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর কাছেই।

ভূমিকম্পের সময়ে দোয়া, তওবা, নামাজ এবং ইস্তিগফার করা মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল ﷺ এ ধরনের অবস্থায় এই দোয়া পড়তেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি এর ভালো চাইছি এবং এর অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।”

এছাড়া বেশি বলা উচিত:
“আস্তাগফিরুল্লাহ রব্বি মিন কুল্লি জানবি।”

ভূমিকম্প মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য নয়; বরং তাকে ভাবতে শেখানোর জন্য। প্রকৃত শক্তি আল্লাহর হাতে, আর মানুষের কর্তব্য হলো তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া, সৎপথে থাকা এবং দোয়া ও ইস্তিগফারকে শক্তি হিসেবে নেওয়া।

ভূমিকম্প হলে মুসলমান কী করবে

ভূমিকম্পের মুহূর্ত একজন মুসলমানকে সবচেয়ে আগে তওবা ও ইস্তিগফারের দিকে ফিরে যেতে শেখায়। বিপদের সময় মানুষের হৃদয় নরম হয়ে যায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা অত্যন্ত মূল্যবান। ইস্তিগফার মানুষকে আল্লাহর রহমতের দিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। তাই কম্পন শুরু হোক বা শেষ হয়ে যাক, মুসলমানের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তওবার মাধ্যমে নিজেকে তাঁর কাছে সমর্পণ করা।

এমন অবস্থায় দোয়া ও নামাজ একজন মুসলমানের মানসিক শক্তির প্রধান ভিত্তি। ভয়, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য যে প্রশান্তি একজন মানুষ খোঁজে, তা আল্লাহর স্মরণেই পাওয়া যায়। রাসূল ﷺ বিপদের সময় বিশেষ দোয়া পড়তেন, আর তিনি সাহাবিদেরও সংকটের মুহূর্তে নফল নামাজ পড়ার উৎসাহ দিতেন। দোয়া মানুষের হৃদয়কে স্থির রাখে এবং তাকে আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে নির্ভরশীল করে।

ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতিতে গুজব ছড়ানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং ক্ষতিকর। গুজব আতঙ্ক বাড়ায়, ভুল ধারণা সৃষ্টি করে এবং মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ইসলাম সবসময় সত্য কথা বলার নির্দেশ দেয় এবং ভয় ছড়ানোকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাই এমন সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার না করা একজন মুসলমানের কর্তব্য।

কম্পন শুরু হলে বা শেষ হওয়ার পর নিরাপদ স্থানে থাকা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, আর নিজের প্রাণকে অযথা ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ইসলামসম্মত নয়। তাই ভূমিকম্পের মুহূর্তে আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি না করে, নিরাপদ জায়গা খুঁজে আশ্রয় নেওয়া, মাথা রক্ষা করা এবং অস্থিরতা কমানো একজন মুসলমানের বুদ্ধিমানের কাজ।

সঙ্কটের সময় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য। ভূমিকম্পের পর আহত, ক্ষতিগ্রস্ত বা আতঙ্কিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো সওয়াবের কাজ। রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট লাঘব করবেন। তাই খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয়, মানসিক সহায়তা—যা সম্ভব তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুসলমানের সুন্দর গুণ।

ভূমিকম্প সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্নোত্তরঃ

ইসলামে ভূমিকম্পকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?

ইসলাম ভূমিকম্পকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে। কখনও এটি মানুষের জন্য সতর্কতা, আবার কখনও পরীক্ষা। প্রতিটি ভূমিকম্পকে শাস্তি বলা ঠিক নয়; বরং এটি শিক্ষার সুযোগ।

ভূমিকম্পের সময় কোন দোয়া পড়তে হয়?

ভূমিকম্পের সময় পড়তে হয়:
“اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا”
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি এর ভালো চাইছি, আর এর অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।”

ভূমিকম্প কি আল্লাহর আজাব হতে পারে?

কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে, তবে সব সময় নয়। কুরআন ও হাদিসে দেখা যায়—আল্লাহ যখন কোনও জাতিকে সতর্ক করেন বা পরীক্ষা করেন, তখন বিভিন্ন প্রকার বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক ভূমিকম্পকে আজাব বলা অজ্ঞতা।

ভূমিকম্পে ইস্তিগফার পড়া কি সুন্নাহ?

হ্যাঁ, ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত লাভের উপায় এবং বিপদের মুহূর্তে এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল।

ভূমিকম্প হলে মুসলমান কী করবে?

তওবা করবে, দোয়া ও নামাজের দিকে ফিরে যাবে, গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকবে, নিরাপদ স্থানে থাকবে এবং মানুষের সাহায্য করবে।

ভূমিকম্প সম্পর্কে কুরআনে কোন আয়াত আছে?

সূরা আল-মুলক ৬৭:১৬-এ আল্লাহ বলেন—
“তোমরা কি নিশ্চিত যে তিনি তোমাদেরকে নিয়ে জমিন ধসিয়ে দেবেন না, আর জমিন তখন থর থর করে কাঁপবে?”

ভূমিকম্প কি কিয়ামতের একটি নিদর্শন?

হাদিসে শেষ জামানায় ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তবে প্রতিটি ভূমিকম্প কিয়ামতের জন্য বিশেষ ইঙ্গিত নয়।

ভূমিকম্পের পর মানুষকে সাহায্য করা কি জরুরি?

হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অন্যের কষ্ট দূর করে, আল্লাহ তার কষ্ট দূর করবেন।”

ভূমিকম্প কি শুধুই বৈজ্ঞানিক ঘটনা?

বিজ্ঞান এর ভৌত কারণ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু ইসলাম বলে—সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অংশ। সুতরাং এটি একই সঙ্গে একটি প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতা।

ভূমিকম্প হলে আতঙ্কে দৌড়ানো কি ঠিক?

না। ইসলামে জীবন রক্ষা সর্বোচ্চ। আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি ঝুঁকি বাড়ায়। বরং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া উচিত।

Author

Islampidia Logo

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ!

আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর আপনার মেইলে পেতে চাইলে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।