গণতন্ত্র কি হারাম? যদি হারাম হয়, তাহলে হারাম প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের আনুগত্য করা যাবে কি?গণতন্ত্র শব্দটি কি আরবি? ইসলামী গণতন্ত্র কাকে বলে? গণতন্ত্র কি পদ্ধতি ইসলাম বিরোধী?

গণতন্ত্র শব্দটি কি আরবি?

গণতন্ত্র (Democracy) শব্দটি আরবি নয়, এটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে। শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ, “Demos” এবং “Kratia,” থেকে গঠিত। “Demos” মানে জনগণ বা সাধারণ মানুষ, এবং “Kratia” মানে শাসন বা ক্ষমতা। তাই, এই দুটি শব্দ একত্রে অর্থ প্রকাশ করে “জনগণের শাসন” বা “সাধারণ মানুষের ক্ষমতা।” গণতন্ত্র একটি মানুষের তৈরি, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ইসলামে গণতন্ত্র হারাম কেন ?

গণতন্ত্র ইসলামের মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক একটি ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে অথবা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি (পার্লামেন্ট সদস্য) এর মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে, এই ব্যবস্থায় আল্লাহর শাসনের পরিবর্তে জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে আইন প্রণয়নের জন্য সকলের একমত হওয়া প্রয়োজন হয় না; বরং অধিকাংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে এমন সব আইন কার্যকর করা হয়, যা জনগণ মানতে বাধ্য, যদিও তা মানব প্রকৃতি, ধর্ম, বা বিবেকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, এই ব্যবস্থায় গর্ভপাত, সমকামিতা, সুদি মুনাফা, ব্যভিচার এবং মদ্যপানকে বৈধ করা হয়েছে। ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে বাতিল করে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের দমন করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, শাসন বা হুকুম দেওয়ার অধিকার কেবল তাঁরই এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি অন্য কাউকে তাঁর শাসনে অংশীদার করতে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়েছেন, তাঁর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কেউ নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন (ভাবানুবাদ): “অতএব, হুকুম দেওয়ার অধিকার সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহর জন্য”

[সূরা গাফের, আয়াত: ১২]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন (ভাবানুবাদ): “আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেওয়ার অধিকার নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”।[সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: “আল্লাহ কি হুকুমদাতাদের শ্রেষ্ঠ নন?” [সূরা ত্বীন, আয়াত: ০৮]

তিনি আরও বলেন (ভাবানুবাদ): “বলুন, তারা কতকাল অবস্থান করেছে- তা আল্লাহই ভাল জানেন। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের গায়েব বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত চমৎকার দেখেন ও শোনেন! তিনি ব্যতীত তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তিনি নিজ হুকুমে কাউকে অংশীদার করান না।”[সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৬]

তিনি আরও বলেন (ভাবানুবাদ): “তারা কি জাহেলিয়াতের হুকুম চায়? বিশ্বাসীদের জন্যে আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুমদাতা আর কে?”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৫০]

আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা এবং তাদের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনিই জানেন কোন বিধান তাদের জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি ক্ষতিকর। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, আচরণ ও অভ্যাস একে অপরের থেকে ভিন্ন। নিজস্ব জীবনের জন্য কোনটি উপযুক্ত, তা মানুষ অনেক সময় নিজেও সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। তাহলে অন্যের জন্য কোনটি উপযুক্ত হবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা মানুষের নেই। এই কারণেই, যেসব দেশে জনগণের তৈরি আইন অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা চলছে, সেসব স্থানে অশান্তি, চারিত্রিক অধঃপতন এবং সামাজিক বিপর্যয়ই বেশি দেখা যায়।

কিছু দেশে গণতন্ত্র কেবল একটি শ্লোগানে পরিণত হয়েছে, যার বাস্তব প্রয়োগ নেই। এই শ্লোগান ব্যবহার করে জনগণকে প্রতারণা করা হয়। বাস্তবতায় রাষ্ট্রপ্রধান ও তার সহযোগীরাই প্রকৃত শাসক, আর জনগণ তাদের অধীন করদাতা ছাড়া কিছু নয়। এর প্রমাণ হলো, শাসকবর্গ যা অপছন্দ করে, তা গণতন্ত্রের আওতায় থাকলেও তারা সহজেই তা উপেক্ষা করে। নির্বাচনে কারচুপি, স্বাধীনতার দমন, সত্য বলার কারণে নিপীড়ন—এমন বাস্তবতাগুলো সবারই জানা। এগুলো প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত কোনো দলিলের প্রয়োজন নেই, যেমন দিনের অস্তিত্ব বোঝাতে আলাদা প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।

‘মাউসুআতুল আদইয়ান ওয়াল মাযাহেব আল-মুআসেরা’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি

পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করে। এ ব্যবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জনগণ সরাসরি শাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। এ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. ভোট দেওয়ার অধিকার: জনগণের একটি নির্দিষ্ট দল কোনো আইনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। এরপর পার্লামেন্টের সংশ্লিষ্ট কমিটি সেটি নিয়ে আলোচনা করে এবং ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়।

২. গণভোট দেওয়ার অধিকার: কোনো একটি আইন যখন পার্লামেন্টে পাস হয়, তখন তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যাতে তাদের রায় নেওয়া যায়।

৩. না-ভোট দেওয়ার অধিকার: কোনো আইন পাসের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি সংবিধান অনুসারে নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ওই আইনের বিরোধিতা করে আপত্তি জানায়, তাহলে বিষয়টি গণভোটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। গণভোটে যদি হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট বেশি হয়, তাহলে আইন কার্যকর হয়; আর না-এর পক্ষে বেশি হলে তা বাতিল হয়ে যায়।

এ পদ্ধতির ইসলামের সাথে দ্বন্দ্ব:
গ্রন্থটিতে এই শাসনব্যবস্থাকে আল্লাহর আইন প্রণয়নের অধিকার খর্ব করার একটি নব্য শিরক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ, এটি আল্লাহর সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আইন প্রণয়ন করার একচ্ছত্র অধিকারকে অস্বীকার করে এবং সেই অধিকার মাখলুক বা মানুষের হাতে তুলে দেয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, আইন প্রণয়ন এবং বিধি নির্ধারণের একমাত্র অধিকার আল্লাহর, আর এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সেই মূলনীতির পরিপন্থী

অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কিছু নামের ইবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। আল্লাহ এদের কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেওয়ার অধিকার নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”।

[সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৫৭]

আল্লাহর উপর ঈমান ও রাসূলদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনার পর আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোন আইন গ্রহণ করার প্রবণতাকে আল্লাহ তা‘আলা ‘বিস্ময়কর’ ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি। কিন্তু তারা তাগূতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে’ (সূরা আন-নিসা : ৬০)।

অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়ার বিধান

বাংলাদেশী ইসলামী পণ্ডিত খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন,

সার্বভৌমত্ব মানে মালিকানা। এটা সহজ যে সার্বভৌম মানে মালিক। যেমন আমি এই জমির মালিক যা সত্য। আমি এখানে দালান তৈরি করতে পারি, ভেঙ্গে ফেলতে পারি, পার্টিশন করতে পারি, বিক্রি করতে পারি। এই মালিকানা আমার আছে। আবার এই জমি আল্লাহর। এটাও সত্য। আর আসল কথা হল, ইসলামের মতে এই জমি দিয়ে আমি অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু এখানে পতিতালয় বানাতে পারি না। মানুষের মালিকানা সীমিত; আল্লাহর মালিকানা অন্য সকল সার্বভৌমত্বের উপর সর্বোচ্চ। আমার মালিকানা পার্থিব, এবং যদি আমি তা আল্লাহর মালিকানার উপর রাখি তবে আমি আল্লাহর কাছে অপরাধী হব। একই সাথে, জনগণই দেশের মালিক, এটি একটি সহজ কথা। যারা বলেন, জনগণকে সার্বভৌম বলা ইসলাম বিরোধী এবং তারাই সকল ক্ষমতার উৎস, আমি তাদের সাথে একমত নই। এখানে ক্ষমতা বলতে ঝড়-বৃষ্টি বা রোগ-ব্যাধির ক্ষমতা বোঝায় না, এর মানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এই ক্ষমতা আসলে মানুষের। ইসলামে জনগণের সম্মতিতেই ক্ষমতা অর্জিত হবে। একটি সমাজে যদি জনগোষ্ঠীর প্রধানরা সম্মতি দেয় এবং জনগণ তাতে সম্মত হয়, এটা ঠিক আছে, এটাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্র ইসলামে জনগণের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব বাধ্যতামূলক। তাই জনগণই রাষ্ট্রের মালিক এবং জনগণই ক্ষমতার উৎস ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে কেউ যদি মনে করে এই মালিকানা মানে যে কেউ যে কোন কিছু করতে পারে; হারামকে (নিষিদ্ধ) হালাল (বৈধ), এবং হালালকে হারাম, তাহলে স্পষ্টতই এটা ইসলাম বিরোধী।(২ এপ্রিল ২০১৪)

গণতন্ত্র কি পদ্ধতি ইসলাম বিরোধী?

গণতন্ত্র পদ্ধতি ইসলাম বিরোধী এবং এর দ্বারা নির্বাচিত সরকারের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের আনুগত্য করা যাবে না।

ইসলামী গণতন্ত্র কাকে বলে?

ইসলামি গণতন্ত্র হচ্ছে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে ইসলামি মূলনীতি বাস্তবায়ন করে থাকে। ইসলামি রাজনীতি তত্ত্বের ইসলামি গণতন্ত্র তিনটি মূল বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিতঃ

  • নেতাদেরকে অবশ্যই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতে হবে
  • শরিয়ার বিষয়বস্তু মানতে হবে
  • “শূরা” অনুশীলনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে, যা “পরামর্শ” শব্দের আরব

 

আখিরাতের বিনিয়োগ বক্স
অনুদানের তহবিল *
সাধারণ তহবিল
বি.দ্র. যাকাত, ফিতরা, মান্নত-এর টাকা এখানে দেয়া যাবে না, দিলেও আদায় হবে না।

Author

Islampidia Logo

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ!

আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর আপনার মেইলে পেতে চাইলে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

By মোঃ আহসান হাবিব

মোঃ আহসান হাবিব হলেন ইসলামপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও এ্যাডমিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।