ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করা। কুরবানি করার পর প্রায় সবার মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন আসে— কুরবানির গোশত কত ভাগ করতে হয়? অনেকেই মনে করেন তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক, আবার কেউ মনে করেন সব গোশত নিজেরাই রাখতে পারবেন না। তাই এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক ধারণা জানা প্রয়োজন।
ইসলামে কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা উত্তম ও সুন্নতসম্মত একটি পদ্ধতি। সাধারণভাবে আলেমরা বলেন, এক ভাগ নিজের ও পরিবারের জন্য রাখা, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের দেওয়া এবং আরেক ভাগ গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা ভালো। তবে এটি ফরজ বা বাধ্যতামূলক নয়। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী কম-বেশি করা যাবে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাওয়াও।”
— সূরা আল-হাজ্জ: ২৮
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা তা থেকে খাও এবং অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে খাওয়াও।”
— সূরা আল-হাজ্জ: ৩৬
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা কুরবানির গোশত খাওয়ার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ কুরবানির আনন্দ শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; সমাজের অসহায় মানুষদের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।
হাদিসেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা কুরবানির গোশত খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করো।”
— Sahih Muslim
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কুরবানির গোশত নিজেরা খাওয়া, অন্যদের দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা— সবই জায়েজ। তাই কেউ যদি কিছু গোশত ফ্রিজে রেখে পরে খেতে চান, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, তিন ভাগ করা কি বাধ্যতামূলক? এর উত্তর হলো— না। ইসলামে নির্দিষ্ট করে তিন ভাগ করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটি উত্তম একটি নিয়ম মাত্র। যদি কোনো পরিবার বড় হয় এবং তাদের প্রয়োজন বেশি থাকে, তাহলে তারা নিজেদের জন্য বেশি অংশ রাখতে পারবে। আবার কেউ যদি গরিব হয়, তাহলে সে পুরো গোশত নিজের পরিবারের জন্যও রাখতে পারবে। অন্যদিকে ধনী ব্যক্তি চাইলে অধিকাংশ গোশত গরিবদের মাঝেও বিতরণ করতে পারেন। ইসলামে এ ব্যাপারে সহজতা রাখা হয়েছে।
কুরবানির অন্যতম শিক্ষা হলো ত্যাগ ও সহমর্মিতা। সমাজের দরিদ্র মানুষ যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকেও ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক গরিব পরিবার আছে যারা বছরে একবারও ভালোভাবে মাংস খেতে পারে না। তাই কুরবানির সময় তাদের কথা মনে রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
আত্মীয়স্বজনদের মাঝেও গোশত বিতরণ করা উত্তম আমল। এতে আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গরিব আত্মীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ইসলাম সবসময় আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহ দিয়েছে।
অনেকেই জানতে চান, অমুসলিম প্রতিবেশীকে কুরবানির গোশত দেওয়া যাবে কি না। অধিকাংশ আলেমের মতে, শান্তিপূর্ণ অমুসলিম প্রতিবেশী বা পরিচিত কাউকে উপহার হিসেবে কুরবানির গোশত দেওয়া জায়েজ। কারণ ইসলাম সুন্দর আচরণ ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দেয়।
কুরবানির গোশত বিক্রি করা জায়েজ নয়। একইভাবে কুরবানির চামড়া বিক্রি করে ব্যক্তিগত কাজে টাকা ব্যবহার করাও ঠিক নয়। চামড়ার মূল্য গরিবদের মাঝে দান করা উত্তম। এছাড়া কসাইকে মজুরি হিসেবে গোশত বা চামড়া দেওয়া উচিত নয়; তাকে আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে।
বর্তমান সময়ে অনেকেই কুরবানির গোশত সংরক্ষণ করেন। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে কিছু সময় গোশত সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলেন, পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তাই এখন ফ্রিজে রেখে পরে খাওয়া বৈধ।
সবশেষে বলা যায়, কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা উত্তম হলেও এটি বাধ্যতামূলক নয়। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের মাঝে আনন্দ ও সহমর্মিতা ছড়িয়ে দেওয়া। তাই কুরবানির সময় দরিদ্র, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কথা মনে রেখে সুন্দরভাবে গোশত বিতরণ করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কুরবানি আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

