সারসংক্ষেপ

  • নবী মুহাম্মদ (সা.) ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা; তাঁর জন্ম আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় (হাতিল বা হাতিল বর্ষ) হয়েছিল। ৪০ বছর বয়সে (৬১০ খ্রিঃ) গুহা হিরায় প্রথম ওহি লাভ করে তিনি দীনের দাওয়াত শুরু করেন। পরবর্তী ১২ বছর মক্কায় প্রচার ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেন।
  • ৬২২ খ্রিঃ হিজরতের মাধ্যমে মক্কা থেকে মদিনায় (ইসলামগ্রাম) স্থানান্তর করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় তিনি সামাজিক ও আইনি সংস্কার চালু করেন, সংবিধানের নীতিতে (মিথাক–এ মদিনা) বিভিন্ন সম্প্রদায়কে এক রাষ্ট্র গোষ্ঠীতে মিলিত করেন।
  • মদিনায় ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করে। বদর (৬২৪), উহুদ (৬২৫), খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭) ও হুদেরবিয়া চুক্তি (৬২৮) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই পর্যায়ে ঘটে। ৬৩০ খ্রিঃ মক্কা পরাজিত এবং মুসলিমদের নিকট পতনের পর নবী সা.-এর নেতৃত্বে মক্কা বিজয় লাভ হয়; পরবর্তী বছর ৬৩২-এ তিনি বিদায় হজ পালন করে ইন্তেকাল করেন।
  • নবী (সা.) ছিলেন দয়াশীল, নম্র ও ন্যায্য; তিনি নিজেকে “পবিত্র চরিত্রের সম্পূর্ণতা” প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো হয়েছি**। কুরআনে তাঁর (সা.) বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহে আছে আদর্শ”।
  • মৃত্যুর পর তৎকালীন খলিফা আবু বকর (র.) নির্দেশে কুরআনের আদি সংকলন শুরু হয়; উসমান (র.) যুগে একটি স্বীকৃত মুসমাদ (উসমানি মুশাফ) প্রকাশিত হয়। নবী (সা.)-এর বাণীসমূহ (হাদীস) পরবর্তী শতাব্দীতে বিখ্যাত সংগ্রহে সংকলিত হয়।

গোত্র, পূর্বপুরুষ ও শৈশব

নবী মুহাম্মদ (সা.) হলেন কুরাইশ গোত্রের হাশেম শাখার সদস্য। তাঁর পিতা শহীদ আবদুল্লাহ (জন্মের আগে) ও মা আমিনা বন্ত ওয়াহব ছিলেন। তাঁর পিতা মারা যাওয়ার পর (নবীর জন্মের আগেই) দত্তক পিতাপক্ষের দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয় দাদার (আব্দুল মুতালিব) হাতে, কিন্তু নবী যখন ছয় বছর বয়সী তখন দাদাও ইন্তেকাল করেন। তখন তৎকালীন মৌলভীর দায়িত্ব নেন মামা আবু তালিব।

আজকের গবেষণায় নবীর জন্মবছর হিসেবে প্রচলিত ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ (হাতিল বর্ষ) উল্লেখ করা হয়। তবে কিছু ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-সূত্র Year of the Elephant হিসেবে পরিচিত সেই বছরের পরিবর্তে ৫৬৯ খ্রিস্টাব্দ হওয়ার সম্ভাবনাও দেখিয়েছেন। নবীর বেড়ে ওঠা মক্কায়, যা তখন আরব উপদ্বীপের বাণিজ্য ও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল, কুরআনের আয়াতে ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর কাবা নির্মাণকাজের কথা বর্ণিত (সুরা-বাকারা ২:১২৭)। নবী (সা.) এর পূর্বপুরুষ হিসেবে বর্ণিত হয় ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)।

নবী (সা.)-এর ব্যক্তিগত জীবন

নবী (সা.) ছোটবেলায় ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত (“আল-আমিন” উপাধিতে ভূষিত)। বাল্যকালে তিনি আনুপাতিকভাবে প্রজীবন উপার্জন করে ছিলেন, পশু রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবসার মধ্যে নিযুক্ত ছিলেন। তার চার কুঁড়ে ছিল যাত্রাগৃহ (কারবালা) ও খাদিজা (র.)। বয়স প্রায় ২৫ বছরে তিনি মক্কার ধনী বিধবা খাদিজা (র.)-এর সঙ্গে বিয়ে করেন। খাদিজা (র.)-এর সঙ্গে ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে নবী (সা.)-এর ৪টি কন্যা (জাইনব, রুকাইয়া, উম কুল্সুম, ফাতিমা) ও দুজন পুত্র (কাসিম ও আবদুল্লাহ; উভয়ই শিশুকালেই প্রয়াত) জন্মগ্রহণ করে। খাদিজা (র.) জীবিত থাকাকালীন নবী (সা.) আর কেউকে বিবাহ করেননি। খাদিজা (র.)-র মৃত্যুর পর নবী (সা.) বিভিন্ন বয়স ও পটভূমির নারীকে বিয়ে করেন: sawdah, Aisha, Hafsa, Zaynab bint Jahsh, Umm Salama, Zaynab bint Khuzaymah, Juwayriyya, Safiyya ও Maymunah. তদুপরি মিশরের মারিয়াহ (যিনি প্যালেস্টাইনের অলিম্পাস নামক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল)কে রমণের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করেন; এ থেকে তাঁর একটি পুত্র ইবনে হাম্মাদ জন্মগ্রহণ করে, যিনি জীবন্ত থাকেন (নবীর মৃত্যুর পর)। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী নবী (সা.)-এর আনুমানিক ১১ জন স্ত্রী ছিলেন (যাদেরকে উম্মা’তের মুমিনীন বলা হয়); এই সংখ্যা পুরুষ বা নারী কনকুবাইন সমেত গৃহীত হলেও, কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইসলামী ঐতিহ্যে সাধারণত ১১ বিবাহই গ্রহণ করা হয়।

নবুওয়াত লাভ ও দাওয়াতের প্রারম্ভ

অপরাজেয় হৃদয়ে জাগ্রত নবী (সা.) ৪০ বছর বয়সে (৬১০ খ্রিঃ) মাস্কাত হিরা গুহায় মোহাম্মদ (সা.)-এর পরমেশ্বরের দূত ফেরেশতা জিবরাঈলের মাধ্যমে প্রথম ওহি পান। এরপর তিন বছর গোপনে দাওয়াত চালিয়ে অল্পসংখ্যক আশ্রিতদের মধ্যে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। ফুতূহ নামক ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, প্রথম মুসলিমরা ছিলেন খাদিজা (র.) (মহিলা), তদ্ব্যতীত আলী (র.) (শিশু), জাইদ, সালমান ফারসী, আবু বকর (র.) প্রভৃতি। জনসমক্ষে প্রচার ৬১৩ খ্রিঃ থেকে শুরু হলে কুরাইশদের বিরোধিতা বেড়ে যায়। নবী (সা.) নিজেকে আল্লাহ তায়ালার পথে আদর্শ চরিত্রের সম্পূর্ণকরণ (“ইতাম্ম-সালিহা-ল-আখলাক”) প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরিত বলে ঘোষণা করেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহে (সা.) আছে একটি সুন্দর উদাহরণ (উসওয়া-হাসানাহ)”, অর্থাৎ যেকোন মুমিন তার চরিত্রে নবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করবে। নবী (সা.)-এর দায়বদ্ধতা ছিল মানুষকে একই এক আল্লাহর ইবাদতে আহ্বান, ন্যায়বিচার ও মমতাশীলতা প্রচার।

কুরাইশদের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রসারে কট্টর প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে মুসলিম সংখ্য়া কম হওয়ায় তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন নবী (সা.)-এর মামা আবু তালিবের শিব আবু তালিব নামক পর্বতে আশ্রয় দিয়ে একদশক অবরোধ চালায় কুরাইশরা। খাদিজা (র.) ও আবু তালিবের মৃত্যুর (৬১৯ খ্রিঃ) পর নবী (সা.)-এর অবস্থা আরও করুণ হয় (শোকাবছর বলে পরিচিত)। এর পর আল্লাহর হুকুমক্রমে নবী (সা.) যিশুর সমাধির (বিতুল মোকাদ্দাসে) দিকে ফেরেশতা গত রাতে যাত্রা (ইসরা-মিআরজ) করেন। ৬১৬ খ্রিঃ একদল মুসলিম ইথিওপিয়ায় (হিজরত ঐথোপিয়া) যাত্রা করে, আবার ৬২২ খ্রিঃ নিজেস্ব নিরাপত্তার কারণে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।

মদিনায় রাষ্ট্র-নির্মাণ এবং সামাজিক সংস্কার

মদিনায় হিজরতের পর (৬২২ খ্রিঃ) নবী (সা.) প্রথমবারের মতো জনাবাসীর নেতা (ইমাম-মুখতার) হিসেবে গ্রহণ করা হন এবং মদিনার বিভিন্ন অংশের (আন্সার ও মুজাহির) মধ্যে শান্তি-বাহির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য মিথাক-এ মদিনা বা “মদিনা সংবিধান” জারি করেন। এই ঘোষণায় মদিনার মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়দেরকে সামগ্রিক জনগোষ্ঠী (উম্মাহ) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের অধিবাসীরা এক সংকটপূর্ণ একত্রিত সমাজ গঠন করে।

সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে ইসলামের সনদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ব্যপ্তি (মহিলাদের ওয়ারিস হিসেবে স্বীকৃতি), দুর্নীতি পরিহার, অনাথ ও গরিবদের সেবা, শিশু (বিশেষ করে মেয়েদের) কুন্ঠিত হোনোর প্রতিরোধ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসলামের বিধান মোতাবেক শরীয়াহ আইনের আওতায় জীবনযাপন শুরু হলে পুরনো কুসংস্কার যেমন শিশু-কন্যা নরকুলের নিষিদ্ধতা তার অবলুপ্তি ঘটে। মদিনার সমাজে দান-ফরজ, নামাজ, সিয়াম, হজের মতো দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম কমিউনিটি একটি গোটা জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে।

যুদ্ধ ও বৈদেশিক সংঘাত

মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রাবস্থা গড়ে ওঠার পর মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে দ্বন্দ্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। ৬২৪ খ্রিঃ বদরের যুদ্ধে নবী (সা.) ও তাঁর প্রায় ৩০০ সাথী মক্কার বড় সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে (বক্তিগত ও সামরিক মহিমার পরিস্ফুটন)। পরের বছর উহুদের যুদ্ধে (৬২৫ খ্রিঃ) মুসলিম বাহিনী প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তবে সাহাবাগণের সততা ও ঈমানের পরীক্ষা হয়। ৬২৭ খ্রিঃ খন্দকের যুদ্ধ (আবনীর খন্দক বা আল-খন্দক) সংঘটে, যেখানে কুরাইশ ও মদাইনার মিত্রবাহিনী মুসলমানদের ঘেরাও করে; কিন্তু নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে খন্দক খননের কৌশলে তারা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

৬২৮ খ্রিঃ মুবারক হুদেরবিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; এর মাধ্যমে দশ বছরের শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তি হয়। এর ফলে কুরাইশরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমানদের ইসলামী পরিচয় স্বীকার করে এবং পরবর্তী বছর প্রবল সংখ্যায় মদিনায় ইসলামে দীক্ষা নিতে আসে। ৬৩০ খ্রিঃ মক্কা বিজয় ঘটে; নবী (সা.) শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় প্রবেশ করে দানবীর কাবা পরিত্যাগ করে করে আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করেন। এই বিজয়ের ফলে পুরো আরব উপদ্বীপ নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে একত্রিত হতে শুরু করে। ৬৩২ খ্রিঃ পবিত্র বিদায় হজ পালনের পর (দ্বারায় চারমিনার, আরাফাহ) নবী (সা.) তাঁর ঈমানদার উম্মতের প্রতি বিদায় বক্তৃতা দেন এবং তার কয়েক মাস পর মারকাযুল মদিনায় ইন্তেকাল করেন।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন

নবী (সা.) নম্র, সংযমী এবং দয়াশীল ছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি খুব ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতেন। মদিনায় তিনি একটি সাধারণ ঘরে (সাখিফাহ) বসবাস করতেন এবং জুমার নামাজ নিজেই পরিচালনা করতেন। ভিক্ষুকদের উদারতা দেখিয়ে তিনি প্রায়ই নিজের জীবনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়ে অন্যকে বাড়তি দান করতেন। ঐ হাদিসেও বর্ণিত, “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া দেখায় না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না”। তার আমলে কুরাইশীরা সাধারণত কঠোর ছিলেন, কিন্তু নবী (সা.) বলেন, আল্লাহর দয়া প্রেমিকদের প্রতি সর্বদা বর্ষিত হয়।

ইহুদী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক

মদিনায় নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে গড়ে উঠা রাষ্ট্র ছিল বহুধর্মীয়; তৎকালীন ইহুদী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কেও নাগরিক মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। মিথাক-এ মদিনা অনুযায়ী মক্কা থেকে আগত মুসলমান (মুহাজিরুন) ও স্থানীয় (আন্সার) এবং মদিনার ইহুদী সবাই এক রাষ্ট্রগোষ্ঠীতে (“উম্মাহ”) পরিণত হন। নবী (সা.) তাঁর আমলে নাজারান (তৎকালীন পূর্ব আরবের খ্রিস্টান জনপদ) খ্রিস্টান নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও একটি চুক্তি করেন, যা সেখানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি সুরক্ষার দায়িত্ব স্বীকার করেছিল।

কিন্তু কয়েকটি ইহুদী গোত্র (যেমন, বেনু কায়িনুকা, বেনু নাদির, বেনু কুরায়জা) পূর্বে স্বাক্ষর করা শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, বেনু কুরায়জার সম্পূর্ণ দলকে যুদ্ধের পর নির্বাসন দেয়া হয়। এ সকল ঘটনায় হাদিস ও সিরাহতে বিভিন্ন তফসিল থাকে, তবে এতে নবী (সা.)-এর সুষ্ঠু বিচারের প্রচেষ্টা প্রতীয়মান। তবুও নবীর সহিষ্ণুতা ও ন্যায়পালন স্বত্ত্বেও উল্টো দলে কিছু প্রতারণার ঘটনায় এসব কঠোর পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল।

চরিত্র ও শিক্ষণীয় দিক

নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বোচ্চ আদর্শ; কুরআনে সরাসরি তাকে উপস্থাপন করে বলা হয়েছে “রাসূলুল্লাহে আপনারা সবার জন্যে উত্তম আদর্শ”। তিনি নিজে প্রায়শই ইচ্ছেমতো কোনো পার্থক্যবহির্ভূত আচরণ করতেন না, বরং কঠোর ন্যায়বিচার প্রদর্শনে বিশ্বাস করতেন। সাহাবারা বর্ণনা করেন, তিনি খুব শান্ত, নম্র ও মানবিক ছিলেন; প্রাকৃতিক বিপদ-আপদে হৃদয়বিদারক সহানুভূতি দেখাতেন। তিনি নিজেকে কল্যাণমূলক কাজের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন – যেমন দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা প্রশিক্ষণের প্রসার, মহিলা-শিশুর অধিকার সুরক্ষা, ইত্যাদি। হাদিসে এসেছে, “ইন্নামাবুস্তু লিউতম্মিস সালিহআল-আখলাক” অর্থাৎ ‘আমি শুধুমাত্র সম্পূর্ণ নৈতিক চরিত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রেরিত হয়েছি’। এছাড়া “কারও প্রতি দয়া না দেখালে আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না” এবং “যে তোমাদের মধ্যে ভালো, সে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ” (আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে আন্তরিক)-এর মতো বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। নারীর মর্যাদা রক্ষা ও দানের গুরুত্বের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি নিজ ধর্মে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কারুকাজের প্রতি বিরোধিতা দেখাতেন: আনাদরের প্রচলন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ভিক্ষুকদেরকে দান বিতরণের ব্যাপারে উদার হতে বলতেন।

পরবর্তী উত্তরাধিকার ও বিতর্ক

নবীর (সা.) মৃত্যু-পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে চারটি প্রধান শূন্যতা ছিল। বিশিষ্ট হাদিসে (মাসলা-গাদির) শিয়া মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে নবী (সা.) গাদির খুমে আলী (রা.)-কে বিশেষভাবে দাখিল করেছেন, কিন্তু সুনী ঐতিহ্যে নবী (সা.) তার কোনো পরবর্তী নেতা স্পষ্ট করল না। নবী (সা.)-এর মৃত্যুর কয়েক দিন পর সাকিফার বৈঠকে মুহাজির ও আন্সার সাহাবারা আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন। এ নিয়ে এখনও ইসলামের বিভিন্ন মতপন্থার মধ্যে মতবিরোধ বিদ্যমান।

কুরআন ও হাদিস সংকলনের প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য: নবীর (সা.) জীবদ্দশায় কুরআন বিভিন্ন অংশে (শ্লোক আকারে) অবতীর্ণ হত এবং সাহাবারা তা লিখে রাখতেন। নবীর মৃত্যুর পর প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) যুদ্ধের কারণে কুরআন অনেক সাহাবির মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দেখে (খুবাযা ইবনে কাম) আদেশ দেন একত্রে সন্নিবেশ করতে। এরপর উসমান (রা.) যুগে তৃতীয় খলিফা হিসেবে তিনি হাফসা (উমর (রা.)-এর কন্যা) যাঁর কাছে আবু বকর (রা.) যুগে সংকলিত কুরআনের কপি ছিল তা তুলে নিয়ে চার জন সজ্জিত কাগজে চূড়ান্ত সংকলন সম্পন্ন করেন। উসমান তারপরে ওই সুসজ্জিত কুরআনের বেশ কয়েকটি প্রতিলিপি তৈরি করে বিভিন্ন মহানগরে পাঠান এবং বাকি সব বিরোধী বা অনুচার সংস্করণ ধ্বংস করে দেন। এতে কুরআন সংকলনের একরুপতা নিশ্চিত হয়।

নবী (সা.) সম্পর্কে বিতর্কাত্মক আলোচনা ও আধুনিক গবেষণা বেশ কিছু বিষয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্র (সিরাহ সাহিত্যে) একেবারে একরকম নয়; তাদের মধ্যে কিছু অলৌকিক কাহিনী বা বাইবেলের প্রভাবযুক্ত উপাখ্যানও মেশানো বলে মনেযায়। ইসলামী ঐতিহ্য কোন কোন তথ্য নিশ্চিতভাবে প্রত্যয়িত, সেটি নির্ধারণে কোরআন-সুন্নাহ একমাত্র নয়; বাইরের কিছু উৎস যেমন সিরিয়াক বা আর্মেনিয়ান শাস্ত্রমালা নবীর জীবনের ব্যাপারেও কয়েকটি তথ্য দেয়। যেমন নবী (সা.)-এর পতনে ভূগোল, জেনেটিক গবেষণা, নক্ষত্রশাস্ত্র ইত্যাদি সমসাময়িক গবেষণায় বিচার-বিশ্লেষণ হয়ে থাকে। এসব আলোচনায় সবচেয়ে চর্চিত বিষয়গুলোর মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, সাহাবা-উম্মতের মধ্যে ঘটেছিল কী, নবী (সা.)-এর স্বরাষ্ট্রীয় অধিকার ইত্যাদি প্রশ্ন। আমরা এখানে সকল বিষয়ের বিস্তারিত তালিকায় যেতে পারিনি, তবে প্রধান-মান্য ঐতিহাসিক সূত্র এবং একাডেমিক গবেষণা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছি।

সময়রেখা ও তুলনামূলক তথ্য

নীচের সময়রেখা বড় বড় ঘটনাবলীতে ভাগ করা হয়েছে (খ্রিস্টাব্দ অনুসারে):

সাল (খ্রিঃ)ঘটনাবলী
৫৭০নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম (হাতিল বর্ষ, মক্কা)
৬১০গুহা হিরায় প্রথম ওহি লাভ
৬১৩জনসমক্ষে ইসলাম প্রচার শুরু
৬১৯“শোকাবছর” – খাদিজা (র.) ও আবু তালিবের মৃত্যু
৬২২হিজরাত (মক্কা → মদিনা, ১ হিজরি)
৬২৪বদরের যুদ্ধ (মুসলিম বিজয়)
৬২৫উহূদ যুদ্ধ (মুসলিমরা নিরস্ত্র পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত)
৬২৭খন্দক বা আবনীর খন্দকের যুদ্ধ (মক্কা ও মদিনার মিত্রবাহিনী মোকাবিলা)
৬২৮হুদেরবিয়া চুক্তি (মক্কার সাথে দশ বছরের শান্তি)
৬৩০মক্কা বিজয় (নবী (সা.) মক্কায় প্রবেশ করেন)
৬৩২বিদায় হজ (১০ হিজরি) ও পরবর্তী বছরের মৃত্যু (রবি’উল আউয়াল)

কিছু প্রধান বিষয়ের বিতর্কমুখর বিবরণ নিচের তুলনামূলক টেবিলে দেখানো হলো:

বিষয়বিবরণ Aবিবরণ Bউল্লেখযোগ্য উত্স
জন্মতারিখআনুমানিক ৫৭০ খ্রিঃ (হাতিল বর্ষ)গবেষণায় কিছু তথ্য Year of Elephant হিসেবে ৫৬৯ খ্রিঃও দেখিয়েছেঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা
বিবাহ সংখ্যা১১ জন স্ত্রী (খাদিজা (র.)-সহ)আনুমানিক ১৪ জন বিবাহ/পল্লী (বিবিধ ঐতিহ্য অনুযায়ী)বিভিন্ন সিরাহ বর্ণনা

উপসংহার ও পরবর্তী পাঠ

নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল ইসলামের ভিত্তি স্থাপনের একটি মৌলিক ঘটনা। কঠিন প্রতিকূলতার পরও আন্তরিক দয়া, ন্যায়বিচার ও উভায় ধর্মে অধিষ্ঠিত জীবন-দর্শন সৃষ্টি করে তিনি আদর্শ স্থাপনের প্রতি বিশ্বকে উন্মুখ করেছেন। তার শরীয়াহ, সভ্যতা ও সম্প্রদায় বিন্যাস আজও মুসলমান উম্মতের জন্য সর্বোচ্চ দিকনির্দেশনা।

অতিরিক্ত পঠনপাঠন

নিচের গ্রন্থসমূহ প্রাথমিক ও গৌণ উভয় দিক থেকেই অধ্যয়নার্থীদের জন্য উপযোগী:

  • পবিত্র কোরআন (সর্বরূপ অনুবাদ ও তাফসিরসহ) – মূল উৎস।
  • সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তিরমিড়ি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ – নবী (সা.)-এর হাদীস সংকলন।
  • ইবনে ইশাক/ইবনে হিশাম – সীরাত রাসূলুল্লাহ (ইবনে ইশাকের জীবনী সাহিত্য; ইংরেজিতে এ. গুইলিয়ামের অনুবাদ আছে)।
  • তাবারী – তারীক রুসুল ওয়াল-মুলুক (ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস)।
  • মডার্ন বায়োগ্রাফি: ডঃ ওয়াট (William M. Watt) – Muhammad: Prophet and Statesman, মার্টিন লিংস – Muhammad: His Life, আদিল সালাহী – Muhammad: Man and Prophet ইত্যাদি।
  • সাম্প্রতিক গবেষণা: খুলেদ ফারুয়ি, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ-র বাংলা সীরাতাভিধান; জারনাল আর্টিকেলসমূহ।

তথ্যসূত্র: উপরোক্ত নিবন্ধে বর্ণিত প্রত্যেক তথ্যকে প্রামাণ্য কোরআন ও হাদীস, ক্লাসিক সিরাহ ও বিশ্বস্ত ইতিহাসচক্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্রিটানিকা বিশ্বকোষের ইসলামবিদ্যা বিভাগ এবং অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির আধুনিক গবেষণাকে এই নিবন্ধ রচনায় নির্দেশমূলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে তফাৎ আছে, সেগুলো আলাদা টেবিলে উল্লেখ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র সংযোজন করা হয়েছে।

Author

  • Masud Shorif

     

    Masud Shorifবাংলাদেশি অনুবাদক মাসুদ শরীফের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৩ নভেম্বর। ইসলামিক ভাবধারার বই অনুবাদ করে তিনি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রনিকস এন্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।  বর্তমানে তিনি পুরোদস্তুর লেখক-অনুবাদক। পাঠকনন্দিত মাসুদ শরীফ এর বই সমগ্র হলো 'বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মাদ' (ড. হিশাম আল আওয়াদি), 'হালাল বিনোদন' (শাইখ আবু মুয়াবিয়াহ ইমসালই কামদার), 'স্রষ্টা ধর্ম জীবন' (ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপ্স), 'আবু বকর আস-সিদ্দীক: জীবন ও শাসন' (ড. আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী), 'দু'আ বিশ্বাসীদের হাতিয়ার' (ড. ইয়াসিন ক্বাদি) ইত্যাদি। শুধু নিছক অনুবাদগ্রন্থ হিসেবে নয়, মাসুদ শরীফ এর বই পাঠকদের ইসলামিক বইগুলোর সাহিত্যরস বাংলায় অনুভব করতে উদ্দীপনা জোগায়, তাঁর সাবলীল শব্দশৈলীর প্রয়োগ রচনাগুলোতে করে প্রাণসঞ্চার। বর্তমানে এই অনুবাদক স্ত্রী, দুই কন্যা ও মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন।

    View all posts
Islampidia Logo

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ!

আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর আপনার মেইলে পেতে চাইলে যুক্ত হন

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

By মাসুদ শরীফ

  Masud Shorifবাংলাদেশি অনুবাদক মাসুদ শরীফের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৩ নভেম্বর। ইসলামিক ভাবধারার বই অনুবাদ করে তিনি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রনিকস এন্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।  বর্তমানে তিনি পুরোদস্তুর লেখক-অনুবাদক। পাঠকনন্দিত মাসুদ শরীফ এর বই সমগ্র হলো 'বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মাদ' (ড. হিশাম আল আওয়াদি), 'হালাল বিনোদন' (শাইখ আবু মুয়াবিয়াহ ইমসালই কামদার), 'স্রষ্টা ধর্ম জীবন' (ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপ্স), 'আবু বকর আস-সিদ্দীক: জীবন ও শাসন' (ড. আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী), 'দু'আ বিশ্বাসীদের হাতিয়ার' (ড. ইয়াসিন ক্বাদি) ইত্যাদি। শুধু নিছক অনুবাদগ্রন্থ হিসেবে নয়, মাসুদ শরীফ এর বই পাঠকদের ইসলামিক বইগুলোর সাহিত্যরস বাংলায় অনুভব করতে উদ্দীপনা জোগায়, তাঁর সাবলীল শব্দশৈলীর প্রয়োগ রচনাগুলোতে করে প্রাণসঞ্চার। বর্তমানে এই অনুবাদক স্ত্রী, দুই কন্যা ও মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।