জান্নাতে যাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু তাকওয়া অর্জন করতেই হবে। যে তাকওয়া টুকু অর্জন না করিলে জান্নাতে বিনা আযাবে প্রবেশ করা সম্ভব নয় ? প্রশ্নটি করেছেন মুহাম্মাদ আলী নামের একজন ভাই।
উত্তরঃ
প্রিয় ভাই/বোন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তাশীল—“জান্নাতে বিনা আযাবে প্রবেশের জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু তাকওয়া অর্জন করতেই হবে, যে তাকওয়া না থাকলে বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ সম্ভব নয়?” আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাকওয়া দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।
তাকওয়া কী?
তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত সচেতনতা, যা মানুষকে পাপ থেকে রক্ষা করে এবং আনুগত্যের পথে চালিত করে। আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ! অন্তরে আল্লাহকে সেইভাবে ভয় কর, যেভাবে তাকে ভয় করা উচিত। (সাবধান! অন্য কোনও অবস্থায় যেন) তোমাদের মৃত্যু (না আসে, বরং) এই অবস্থায়ই যেন আসে যে, তোমরা মুসলিম।” (সূরা আলে ইমরান: ১০২)
জান্নাতে প্রবেশ সবার আগে আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভরশীল। নবী (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কারো আমলই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না।” সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারও না, ইয়া রাসূলাল্লাহ?” তিনি বললেন: “আমারও না, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ দিয়ে আচ্ছাদিত করেন।” (বুখারী-মুসলিম)
জান্নাতে প্রবেশের দুই স্তর
১. বিলম্বে বা আযাবের পর প্রবেশ: যারা তাওহীদের সাথে মারা যায়, তারা শেষ পর্যন্ত জান্নাতে যাবে, যদিও গুনাহের কারণে জাহান্নামে আযাব ভোগ করতে হয় (পরিশোধের জন্য)। এর সর্বনিম্ন তাকওয়া: শিরক থেকে মুক্ত তাওহীদ। নবী (সা.) বলেছেন: “যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নাম থেকে বের হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
২. বিনা আযাবে সরাসরি প্রবেশ: এটাই আপনার প্রশ্নের মূল। এর জন্য তাকওয়া এমন হতে হবে যাতে গুনাহ এমন পর্যায়ে না পৌঁছে যে জাহান্নামে শোধনের প্রয়োজন হয়। আল্লাহ বলেন: “যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা সেখানে এসে পৌঁছবে, জান্নাতের দরজাগুলো (পূর্ব থেকেই) উন্মুক্ত (দেখতে পাবে)। জান্নাতের দ্বার রক্ষীরা বলবে- তোমাদের উপর শান্তি (বর্ষিত হোক), চমৎকার কাজ করেছ তোমরা, কাজেই চিরকালের জন্য এতে প্রবেশ কর।।” (সূরা যুমার: ৭৩)
সর্বনিম্ন তাকওয়া যা ছাড়া বিনা আযাবে প্রবেশ অসম্ভব
তাকওয়ার মাত্রা পরিমাপযোগ্য নয়, কিন্তু উলামায়ে কিরামের মতে এর স্তর রয়েছে। সর্বনিম্ন যে তাকওয়া ছাড়া বিনা আযাবে প্রবেশ সম্ভব নয়:
- কবীরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা।
- ফরয আদায় করা।
- সগীরা গুনাহ থেকে তাওবা করা।
- আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা)।
যদি এগুলো না থাকে, তাহলে গুনাহের কারণে আযাব হতে পারে (যদিও শেষে জান্নাত)। আল্লাহ বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরা কাহফ: ১১০)
সবচেয়ে নিশ্চিত ও উচ্চতর তাকওয়া: ৭০,০০০ (বা তারও বেশি) এর দল
নবী (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতের ৭০,০০০ লোক বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা ঝাড়ফুঁক করায় না, অশুভ লক্ষণ মানে না, দাগ লাগায় না (কটারাইজ), বরং শুধু তাদের রবের উপর ভরসা করে।” (বুখারী ৬৫৪১, মুসলিম)
এদের তাকওয়া এত উচ্চ যে:
- তারা মানুষের উপর নির্ভর করে না (ঝাড়ফুঁক চায় না)।
- কুসংস্কার মানে না।
- চিকিৎসায় শেষ উপায় ছাড়া দাগ লাগায় না।
- পূর্ণ তাওয়াক্কুল—সবকিছু আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়।
কিছু বর্ণনায় প্রতি হাজারে আরও ৭০,০০০, এমনকি আল্লাহর তিন মুঠো অতিরিক্ত—সংখ্যা কোটি কোটি হতে পারে।
তাকওয়ার স্তরসমূহ (উলামায়ে কিরামের মতে)
১. নিম্নতম: কুফর ও শিরক থেকে বাঁচা। ২. মধ্যম: কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচা। ৩. উচ্চতর: সগীরা গুনাহ থেকে বাঁচা। ৪. সর্বোচ্চ: মুবাহ (জায়েয) কাজেও যা আল্লাহর থেকে গাফেল করে, তা থেকে বাঁচা।
বিনা আযাবের জন্য অন্তত ২য় স্তর + তাওবা + তাওয়াক্কুল দরকার।
করণীয়
- পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রোযা, যাকাত, হজ।
- কবীরা গুনাহ (যিনা, সুদ, মিথ্যা, গীবত) ছাড়ো।
- প্রতিদিন তাওবা করো।
- তাওয়াক্কুল বাড়াও—দুনিয়ার উপায় গ্রহণ করো কিন্তু ফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও।
- দু’আ: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযুবিকা মিনান নার।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই তাকওয়া দান করুন এবং বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করান। আমীন।

