আসসালামু আলাইকুম। এখন থেকে আমরা ১ সপ্তাহের সকল প্রশ্নের উত্তর শুক্রবার দেব। যারা অক্টোবর এর আগে প্রশ্ন করেছেন, তাদের উত্তর এখানে নেই। সম্প্রতি আমাদের ‘প্রশ্ন-উত্তর পর্ব’ এর অক্টোবর ২০২৫ সালের অপ্রকাশিত সকল উত্তর ইসলামপিডিয়ার বিজ্ঞ স্কলারদের দ্বারা প্রদত্ত উত্তরসমূহ প্রকাশ করা হলো।
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি “Crazy Rock” নামক অনলাইন গেম খেলে পয়েন্ট বা রিওয়ার্ডের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করা ইসলামে হালাল কি হারাম তা জানতে চেয়েছেন। গেমটিতে কোনো সরাসরি বাজি বা জুয়া নেই, কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখানো হয় এবং উইথড্রয়াল শর্ত রয়েছে। প্রথমে, গেমটির বিবরণ: গবেষণা থেকে জানা যায় যে “Crazy Rock” একটি মোবাইল অ্যাপ গেম, যেখানে খেলোয়াড়রা ফিজিক্স পাজল খেলে (পাথর ছুড়ে মনস্টার মারা), লেভেল ক্লিয়ার করে কয়েন সংগ্রহ করে, ডেইলি মিশন, লাকি ড্র এবং বিজ্ঞাপন দেখে উপার্জন করে এবং ক্যাশ আউট করতে পারে। এতে দক্ষতা এবং ভাগ্য উভয়ের উপাদান রয়েছে। ইসলামে জুয়া (মায়সির) হারাম। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেন: “হে মু’মিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-পূজা এবং ভাগ্য-নির্ধারণী তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কার্য। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান তো চায় যে, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখবে। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০-৯১)। এ আয়াতে জুয়াকে শয়তানের কাজ বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এতে শত্রুতা, সময় নষ্ট এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরায়। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) জুয়া নিষিদ্ধ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে তার সাথীকে বলে, ‘আয়, আমরা জুয়া খেলি’, সে যেন সদকা করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৮৬৩)। এ হাদীসে জুয়ার প্রস্তাব মাত্রই পাপ, যার কাফফারা সদকা। গেমে প্রাইজ বা রিওয়ার্ডের ব্যাপারে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কোনো প্রতিযোগিতায় (টাকার) পুরস্কার নেই, শুধু তীরন্দাজী, উট দৌড় এবং ঘোড়া দৌড় ছাড়া।” (আবু দাউদ, হাদীস নং: ২৫৭৪; তিরমিযী, হাদীস নং: ১৭০০; আলবানী সহীহ বলেছেন)। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে গেম বা প্রতিযোগিতায় টাকার পুরস্কার শুধু জিহাদের প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জায়েজ, অন্যথায় হারাম। “Crazy Rock” এর মতো গেম এসব ক্যাটাগরিতে পড়ে না, তাই এতে উপার্জিত টাকা হারাম। লাকি ড্রয়ের ব্যাপারে: এটি ভাগ্যভিত্তিক, যা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে জুয়া নিষিদ্ধ (আল-বাকারাহ: ২১৯), যেখানে বলা হয়েছে যে জুয়ায় পাপ বেশি। লাকি ড্র হারাম, কারণ এতে টাকা ঝুঁকিতে থাকে এবং ভাগ্য নির্ভর। বিজ্ঞাপন দেখে উপার্জন: যদি বিজ্ঞাপন হালাল হয় এবং গেমের অংশ না হয়, তবে পৃথকভাবে বিবেচনা করা যায়, কিন্তু গেমের সাথে যুক্ত হলে একই রুলিং। সারাংশে, এ গেম থেকে উপার্জন হারাম, কারণ এতে জুয়ার উপাদান রয়েছে এবং পুরস্কারের সীমাবদ্ধতা লঙ্ঘন করে। আল্লাহ আমাদের হালাল রিজিক দান করুন। জাযাকাল্লাহু খায়রান।
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি নিয়ত করেছিলেন পরীক্ষায় পাস করলে ১০০ রাকাত নফল নামাজ পড়বেন। এখানে আপনি নিয়ত শব্দটি ব্যাবহার করেছেন কিন্তু মানত বা মান্নত শব্দ উল্লেখ করেন নি । তাই আমাদের প্রথমেই জানতে হবে নিয়ত কি? ও মানত কি? আর এদের মধ্যে পার্থক্য কি? নিয়ত অর্থ মন থেকে কোনো ইবাদত করার উদ্দেশ্য করা — অর্থাৎ আল্লাহর জন্য কোনো কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা ও সংকল্প করাকে “নিয়ত” বলা হয়। মানত অর্থ আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদত বা ভালো কাজ করার শর্তসাপেক্ষ অঙ্গীকার করা — একে মানত বলে। এর মানে, আপনি আল্লাহর কাছে কিছু শর্ত সাপেক্ষে কিছু চাইছেন ? যেমনঃ আল্লাহ তুমি আমাকে এটা দিলে আমি ওটা করব। তাই আপনার নিয়ত শব্দটি আসলে মানত হবে । এরকম মানত পুরন করা ওয়াজিব । কুরআনে বলা হয়েছে: “তারা মানত পূরণ করে এবং সেই দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট ব্যাপক হবে।” (সূরা আল-ইনসান: ৭) রাসূল (সা.) বলেছেন: “যে আল্লাহর আনুগত্যের কোনো কাজের মানত করে, সে তা পূরণ করুক।” আপনার ক্ষেত্রে, পরীক্ষায় পাসের শর্তে ১০০ রাকাত নফল নামাজের মানত শর্ত পূরণ হওয়ায় ওয়াজিব হয়েছে। তাই ৩০ রাকাত পড়া মানতের আংশিক পুরন করেছে। সারাংশে, আপনার এই মানত “সাধারণ মানত” । সাধারণ মানত (নজর-ই-মুতলাক) ভঙ্গ করলে কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা নেই; শুধু পরে পূরণ করলেই হয়। নফলের মানত অসম্পূর্ণ থাকলে পরে পড়ে পূরণ করা যায়। তাই আপনি বাকি নামাজের বিনিময়ে আমি দান সদকা করলে নফল এবাদত পূরণ হবে না। জাযাকাল্লাহু খায়রান।
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। সাঈ করার সময় যদি নামাজের সময় হয়ে যায়, তাহলে নামাজ আদায় করা জায়েয। সাঈ একটি ইবাদত, কিন্তু এটি অবিরাম (continuous) হওয়া শর্ত নয়। নামাজ, ওযু, বিশ্রাম ইত্যাদি কারণে বিরতি দেওয়া জায়েয। তাই আপনি নামাজ পড়ার জন্য থেমেছেন — এতে কোনো সমস্যা হয়নি। “যদি কেউ সাঈ করার সময় নামাজ বা অন্য কোনো ওজর (অবশ্যক কারণ) এর জন্য বিরতি দেয়, তবে এতে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ ধারাবাহিকতা (মাওয়ালাত) সাঈর জন্য শর্ত নয়। তবে তাওয়াফের ক্ষেত্রে তা শর্ত।” — (আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব‘, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৭৩) জাযাকাল্লাহু খায়রান।
ওয়ালাইকুমুস সালাম। এই আয়াতের অর্থ হলো — অন্যের প্রাপ্ত নিয়ামতের প্রতি ঈর্ষা ও অসন্তোষ দেখানো নিষিদ্ধ; তবে হালাল উপায়ে উত্তম অবস্থার জন্য দোয়া ও চেষ্টা করা বৈধ ও প্রশংসনীয়। অর্থাৎ, “আমি যেনও এমন ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারি” — এভাবে চাওয়া ইসলামসম্মত; কিন্তু “আমি যদি ওর জায়গায় হতাম” — ঈর্ষার ভাব নিয়ে বলা অনুচিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, “আল্লাহর অনুগ্রহ চাও এবং জান্নাত চাইলে জান্নাতুল ফেরদৌস চাও।” (সহিহ বুখারি) জাযাকাল্লাহু খায়রান।
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ইসলামে অন্যায়ের সমর্থন ও দুষ্কৃতিকারীকে প্রশ্রয় দেয়া হারাম এবং কবিরা গুনাহ। তবে কুরআনে (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৯৯–২০০) ক্ষমাশীলতা, সদুপদেশ ও জাহিলদের এড়িয়ে চলার যে নির্দেশ এসেছে, তা অন্যায়ের প্রশ্রয় নয় বরং হিকমতপূর্ণ দাওয়াতি পদ্ধতি। ক্ষমা তখনই প্রশংসনীয়, যখন তা অন্যায় বন্ধের উপায় হয় এবং কাউকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। আর সৎ উপদেশ ও জাহিলদের এড়িয়ে চলা তখনই সঠিক, যখন তা উত্তেজনা কমিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। কাজেই একজন মুসলিমের করণীয় হলো—দৃঢ়ভাবে অন্যায়ের বিরোধিতা করা, তবে তা যেন রাগ, অপমান বা অন্যায় প্রতিশোধে পরিণত না হয়; বরং হিকমত ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করা। জাযাকাল্লাহু খায়রান।

